[english_date], [bangla_day]

ভোলার আতঙ্ক ‘০০ নাইন’ গ্রুপ!

আপডেট: August 21, 2019

অনলাইন ডেস্ক :: পবিত্র হজ পালনের জন্য মোহন মিয়া নামের এক ব্যক্তি গত মাসে সৌদি আরব যাচ্ছিলেন।

ঢাকায় যাওয়ার জন্য ভোলার দৌলতখান উপজেলা লঞ্চঘাটে তাকে এগিয়ে দিতে আসেন তার মেয়ে ও স্ত্রী। রাতে লঞ্চ ছাড়ার আগ মুহূর্তে তিনি খবর পান, ওই ঘাট থেকে তার মেয়েকে (নবম শ্রেণির ছাত্রী) তুলে নিয়ে যাবে ‘০০ নাইন’ গ্রুপ (কিশোর গ্যাং-আকাশ)। উপায়ান্তর না দেখে মোহন মিয়া তৎক্ষণাৎ সাহায্য চান এক যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতার। ওই যাত্রায় রক্ষা পায় মেয়েটি।

এছাড়া রাস্তায় দল বেঁধে কিশোরদের সিগারেট টানা ও ধোঁয়া ছাড়ার বদ অভ্যাস ত্যাগ করার উপদেশ দেয়ায় দৌলতখান বাজারের প্রথিতযশা ডাক্তার বাদল প্রিয় সরকার ও তার পিতা প্রবীণ ডাক্তার বিরেন ঘোষালকে দোকানের মধ্যেই পিটিয়ে রক্তাক্ত করা ছাড়াও তাদের ওষুধের দোকানটি ভাংচুর করা হয়।

ওদিকে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান চলছিল দৌলতখান উপজেলা মিলনায়তনে। ছিলেন ইউএনওসহ উপজেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের প্রায় সবাই। ঠিক ওই সময় স্কুলছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করছিলেন কিশোর গ্যাং লিডার।

অবস্থা বেগতিক দেখে মঞ্চ ছেড়ে এগিয়ে যান স্বয়ং উপজেলা নির্বাহী অফিসার। গ্যাং লিডারের গালে কষে এক চড় বসিয়ে দেন।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছিলেন কিশোররা। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শেষ পর্যন্ত তারা রণে ভঙ্গ দিয়ে কেটে পড়েন।

প্রতিদিনই তিন বেলা করে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবেশ পথে সাইরেন বাজিয়ে মোটরসাইকেলের মহড়া দেয়া, প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও বিক্রি করা, স্কুলছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা, সর্বশেষ ২৪ জুলাই দৌলতখান আবু আবদুল্লাহ কলেজে ঢুকে ভাংচুর করা ও স্নাতক শ্রেণির ছাত্রদের মারধরের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গোটা এলাকায়।

এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটিয়েছে নবী নেওয়াজ আকাশ ও তার ‘০০ নাইন গ্রুপ’। দৌলতখান সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র আকাশ। নবম শ্রেণির সঙ্গে মিল রেখে আকাশ তার গ্রুপের নাম রেখেছেন ‘০০ নাইন’।

আকাশের পিতা ভোলার দৌলতখান পৌরসভার মেয়র জাকির হোসেন তালুকদার। পৌর পিতার এই ছেলের অপকর্ম নিয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকেই আকাশের বাহিনী নিয়ে কথা বলেছেন। বলা হয়েছে- ‘০০ নাইন’ ফার্স্ট ইন কমান্ড হচ্ছে তানজিব রনজু। কাগজেপত্রে কলেজছাত্র হলেও আকাশের দলেই তার অবস্থান। তার বিরুদ্ধেও মেয়ে অপহরণের অভিযোগ রয়েছে। তাদের আরেক দোসর হচ্ছেন আদালী বংশের সাকিল। তাদের প্রশ্রয় দাতা হিসেবে রয়েছেন এক যুবলীগ নেতা।

৬ মাস আগে দৌলতখান আবু আবদুল্লাহ কলেজে স্নাতক শ্রেণির ছাত্র শামিম পরীক্ষা দিতে হলে প্রবেশ করার সময় তার হাঁটুতে লোহার রড ঠুকিয়ে দিয়ে উল্লাস করে “০০ নাইন’ গ্রুপের সদস্যরা। এর কোনো বিচার হয়নি আজ পর্যন্ত।

চা দোকানি কামালের ছেলেকে পিটিয়ে আহত করে উল্টো ওই নিরপরাধীর ছেলের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেয় আকাশ। রিকশায় চড়ে ঘুরে বেড়ানোর পর রিকশাচালক সালাউদ্দিন ভাড়া চাইলে, তাকে বেদম পেটানো হয়। শুধু তাই নয়, তার উপার্জনের একমাত্র হাতিয়ার দেড় লাখ টাকা দামের ব্যাটারি চালিত অটো রিকশাটিও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় আকাশের বাহিনী।

ঘটনাটি ছিল গত ঈদুল ফিতরের পর পরই। স্কুল সময়ে ক্লাসে উপস্থিত না থেকে পথে পথে মোটরসাইকেলে উচ্চ শব্দে সাইরেন বাজিয়ে মহড়া দেয়া। স্কুলছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করা আকাশ বাহিনীর নিয়মিত কাজের অংশ হয়ে উঠেছে। এমনকি স্কুলের নবম শ্রেণির কয়েকজন মেধাবী ছাত্রকে তার দলে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে আকাশের বিরুদ্ধে।

এমন পরিস্থিতিতে স্কুল শিক্ষক ও অভিভাবকরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার, থানার ওসি, এমনকি পুলিশ সুপারের কাছেও অভিযোগ করেছেন। আকাশের ফেসবুক আইডিতে লেখা রয়েছে সবাই যেখানে থমকে দাঁড়ায়, আমি সেখান থেকেই শুরু করি।” তার দলের সদস্য প্রিন্স সাব্বির রহমানের প্রোফাইলে লেখা রয়েছে, ‘আমাকে জানতে এসো না, নিজেকে ভুলে যাবে।’

ওই দলের অপর সদস্য মাহি’র ফেসবুক প্রোফাইলে লেখা আছে ‘পরাজয়ের কোনো স্থান নেই।’ এদের কাছে মাদক সরবরাহ করার অভিযোগ রয়েছে বিপুল তালুকদারের বিরুদ্ধে। এর আগে বিপুলকে একাধিকবার ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে পুলিশ।

দৌলতখান থানার ওসি এনায়েত হোসেন জানান কবির সরদারের ছেলে রনজু এবং আকাশসহ একটি গ্রুপ গত ২৪ জুলাই দৌলতখান সরকারি আবু আবদুল্লাহ কলেজে প্রবেশ করে কয়েকজন ছাত্রকে মারধর করে। ওই ঘটনায় ছাত্ররা বাদী হয়ে থানায় মামলা করে। ওই হামলার প্রতিবাদে কলেজের ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এর পর থেকে আসামিরা পলাতক রয়েছে।

এছাড়া অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ করে, কিন্তু লিখিত অভিযোগ না পাওয়ায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয় না অনেক সময়।

‘০০ নাইন’ গ্রুপ : জেলার এক সময়ের শিক্ষিত, সভ্য ও আদর্শ অঞ্চল হিসেবে খ্যাত দৌলতখান উপজেলায় এখন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে নবম শ্রেণির ছাত্র নবী নেওয়াজ আকাশ ও রনজু। এই গ্রুপের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ মেয়র জাকির হোসেনের পুত্র আকাশের হাতেই। এছাড়া কবির সরদারের ছেলে তানজিব রনজু হচ্ছেন গ্রুপের (মোনস্টার) ফার্স্ট ইন কমান্ড, আনজু মিস্ত্রীর ছেলে সাকিল (সেকেন্ড ইন কমান্ড), রুহুল আমিন মিয়ার ছেলে আরিফ, মঞ্জু মাঝির ছেলে মো. বাবু, শাহ নেওয়াজ চৌধুরীর ছেলে মাহি, সাব্বির, মো. মিরাজ, মো. আলিফ ও মিততাহুলসহ আরও অনেকেই সক্রিয় রয়েছেন।

এদের সবার ফেসবুক বর্তমানে লক করে রাখা হয়েছে। প্রথম ৬ জন কলেজে হামলা মামলায় আসামি করার পর থেকেই তারা পলাতক।

এলাকার কিশোর গ্যাং নিয়ে কথা হয় দৌলতখান উপজেলা চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগ সহসভাপতি মনজুর আলম খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, পৌর মেয়রের ছেলের এমন গ্রুপে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ সত্যিই দুঃখজনক।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার জীতেন্দ্র নাথ জানান, নবম শ্রেণির ছাত্রদের যেখানে লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে নানা অভিযোগ উঠছে। তিনি এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানান।

ওসি এনায়েত হোসেন জানান, শিগগিরই অভিভাবকদের নিয়ে সভা ডাকা হবে। কিশোর অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জেলার মৎস্য, বনবিভাগ ও পাউবো কর্মকর্তাসহ অনেকেই। ছেলের অপকর্ম নিয়ে কথা হয় মেয়র জাকির হোসেন তালুকদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ছেলের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগই সত্য নয়। রাজনৈতিকভাবে তার সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে প্রতিপক্ষ নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে।

কলেজে হামলার বিষয়ে যে মামলা হয়েছে, তা স্কুলছাত্রদের সঙ্গে কলেজ ছাত্রদের ঘটনা। একা তার ছেলের বিষয় নয়। ওই ঘটনা সমঝোতা হয়ে গেছে। পারিবারিকভাবে তার ছেলেকে শাসনে রাখার দাবি করে বলেন, ছেলেকে আর এলাকায় আনছি না। তাকে ঢাকায় রেখে লেখাপড়া করাব।

সুত্র : যুগান্তর

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন